সুন্দরবনের জলদস্যুদের জীবনে ফেরার গল্প বইটির রিভিউ - লেখক : মোহসীন উল হাকিম | Sundorboner Joldossuder Jibone Ferar Golpo

  • সুন্দরবনের জলদস্যুদের জীবনে ফেরার গল্প
  • লেখক : মোহসীন-উল হাকিম
  • প্রকাশনী : আল-হামরা প্রকাশনী
  • বিষয় : পেশাগত স্মৃতিচারণ ও অভিজ্ঞতা
  • পৃষ্ঠা : 159, কভার : হার্ড কভার, সংস্করণ : 1st Published, 2021
  • আইএসবিএন : 9789849523734, ভাষা : বাংলা

খুব বেশিদিন আগের কথা না সময় বোধ করি ২০১৪-১৫। তখন বেশ নিয়ম করে প্রথম আলো পড়তাম। বিশাল সংখ্যক পেজের প্রথম আলোর দাম তখন ছিল ৮ টাকাই সম্ভবত। সে যাক, একই ধরণের খবর নিয়মিত চোখে পড়তো। খবরের প্রধান ভাষ্য মোটামুটি এরকম, "সুন্দরবনে মাছ ধরতে গিয়ে বনদস্যু কর্তৃক জেলে অপহৃত, মুক্তিপণ দাবী।"



সুন্দরবন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে বিস্তৃত ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট। ভারত-বাংলাদেশ বিস্তৃত লোনা পানির জঙ্গলটি পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। আয়তনে প্রায় দশ হাজার বর্গ কিলোমিটার। দুর্গম ও শ্বাপদসঙ্কুল এই বন লোকসমাগম থেকে অনেকটা বাইরে। সুন্দরবনের দস্যুতার ইতিহাসও তাই কয়েকশ বছরের। বাংলা অঞ্চলটি বিভিন্ন সময়ে শাসিত হয়েছে গৌড়, নদীয়া, দিল্লি, ঢাকা, মুর্শিবাদ বা রাজমহল থেকে। বাংলার সবকটি রাজধানীই ছিল সুন্দরবন থেকে বেশ কয়েকশত কিলোমিটার দূরে। তাই ষোড়শ শতক নাগাদই এখানে পত্তন হয়েছিল দস্যুতার ভিত, যার প্রমাণ মিলে জেসুইট পাদ্রীদের লেখায়। কালক্রমে এই দস্যুতায় যোগ দেয় পর্তুগাল, হল্যাণ্ড স্প্যানিশ সহ বেশি কিছু দেশের নাগরিক। উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসন জেঁকে বসলে কিছুটা নিয়ন্ত্রনে আসে দস্যুতা। ব্রিটিশরা জমি ইজারা দিয়ে সুন্দরবনের প্রান্তে লোকবসতি স্থাপনে চেষ্টা করে। এখন থেকে দেড়-দু'শো বছর এই দুর্গম এলাকায় টিকে থাকা সহজ কাজ ছিল না। 

সরকারের অনুমতি নিয়ে সেখানে পুনর্বাসিত করা হয় জেলের কয়েদীদের। জমিদাররাও নিজেদের স্বার্থে পুষতো ডাকতদল। ৪৭ এর পর ডাকাতরা আস্তানা গাড়ে বনের ভেতরে, যুক্ত হয় আন্তঃসীমান্ত চোরাচালানিতে। দেশ স্বাধীন হলে ডাকাতদের রমরমা আরো বাড়ে, তাদের হাতে ওঠে অত্যাধুনিক অ*স্ত্র। 
সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চল হওয়ায় সুন্দরবনকে পড়তে হয় এক নিয়মিত চ্যালেঞ্জে, ঘূর্ণিঝড়। সাল ২০০৯, সুন্দরবন উপকূলে আঘাত হানে এক ঘূর্ণিঝড়, নাম আইলা। আইলা খুব বেশি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ছিল এমন না, গতি ছিল মাত্র ১১০ কিলোমিটার/ঘন্টা (৩ মিনিট স্থিতি)। 

তবে অমাবস্যার সময়ে উপকূলে আছড়ে পড়া ঝড়টি সাথে নিয়ে এসেছিল ১০ ফুট উচ্চতার ভয়ংকর জলোচ্ছ্বাস। এতো প্রলয়ঙ্কারী জলোচ্ছ্বাসের জন্য তৈরি ছিল না উপকূলের মানুষের। আইলা সম্পদহানির দিক বিবেচনায় বঙ্গোপসাগরে অন্যতম এক ঝড়। সেসময় দেশ টিভির সাংবাদিক হিসেবে মোহসীন উল হাকিম কাভার করতে গিয়েছিলেন ঝড়ের খবর। আর সেখানেই গল্পের মোড়। তিনি দেখেন ঝড়ের চেয়ে দস্যুর ভয়ে কাতর সেখানের অসহায় জনসাধারণ। 

"হঠাৎ পশ্চিম দিক থেকে মৌমাছির মতো গুনগুন শব্দে আমরা নড়েচড়ে বসলাম। সঙ্গে পানির সরসর শব্দ। ঘড়িতে দেখলাম রাত বারোটা। ট্রলারে জড়োসড়ো সবাই। শব্দটা এগিয়ে আসছে। অজানা ভয় আর শঙ্কায় নিজেদের হৃৎকম্পনও শুনতে পাচ্ছিলাম।"

মোহসীন উল হাকিম বর্তমানে কর্মরত আছেন যমুনা টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে। ২০০৯ এ দেশ টিভিতে কর্মরত থাকার সময় তার নজরে আসে সুন্দরবনের দস্যু সমস্যা। সমস্যা এতোই প্রকট ছিল যে গহীন বনের ভেতরকার বেশ কিছু ফরেস্ট অফিসে ছিল দস্যুদের অবাধ যাওয়া আসা। সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় যেন এক আলাদা বাস্তুসংস্থান। এলাকার প্রভাবশালীরা (মহাজন) দরিদ্র জেলেদের ধরিয়ে দেন দস্যুদের হাতে, তারপর ধারে মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়িয়ে আনেন জেলেদের। এই ধারের টাকা চক্রে এরপর জীবনের জন্য আটকা জেলেরা৷ দস্যুদেরও টিকিয়ে রাখতেন এসব প্রভাবশালীরাই। মূলত যেসব মানুষ কোন মামলা-মোকদ্দমায় ফেরারী, ধার পরিশোধে অপারগ তারাই দস্যুদলে আসতেন। অনেকসময় আবার অপহৃত জেলেদের যারা মুক্তিপণ দিতে পারতেন না তাদেরও নেয়া হতো দস্যু দলে। দস্যুদের জীবনেও বেশ সুখের ছিল তা না। ছিল দলে-দলে রেষারেষি, ছিল ক্রস*ফায়া*রের ভয়। তারাও চাচ্ছিলেন আত্মসমর্পণ এর এক নিরাপদ রাস্তা। 
২০০৯-২০১৮ এক দীর্ঘ বিপদসংকুল পথে হেঁটেছেন মোহসীন-উল-হাকিম। চ্যালেঞ্জটা ছিল ত্রিমুখী। 

প্রথমত দস্যুদের আস্থা অর্জন, দ্বিতীয়ত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে সমন্বয়, শেষতঃ দস্যুদের পৃষ্ঠপোষকদের রক্তচক্ষু। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মোহসীন গিয়েছেন দস্যুদের ডেরায়। আলোচনা করেছেন ঘন্টার পর ঘন্টা। রাজি করিয়েছেন আত্মসমর্পণে। শুরুর দিকে বেশকিছু অসহযোগিতা পেয়েছিলেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে। হয়েছেন বিরাগভাজন। ২০১১ আর ২০১৩ তে দুবার হয়েছেন প্রত্যাখাত। সরকার গঠিত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ টাস্কফোর্স চেয়েছিল প্রচলিত উপায়ে দস্যু সমস্যা এর সমাধান টানতে। দস্যুনেতাদের আটকের পর ক্রস*ফা*য়ার ও করার কথা লেখা হয়েছে বইটিতে। কিন্তু এতে দস্যুদের হিং*স্রতা বেড়েছিল কয়েকগুণ। তারা বেঁকে বসে আত্মসমর্পণ থেকে। অবশেষে সব বাঁধা পেরিয়ে র‍্যাবের উঁচুমহল ও সরকারের সহায়তায় ২০১৬ সালে মাস্টার বাহিনীর আত্মসমার্পণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় সুন্দরবনের দস্যুতার শেষের শুরু। ২০১৮ সালের নভেম্বরে সাত্তার বাহিনীর আত্মসমার্পণে নামে যার পর্দা। এরমধ্যে আত্মসমার্পণ করে আরো ৩০ টি বাহিনী। সুন্দরবন হয় দস্যুমুক্ত। তবে লেখকের আক্ষেপ দস্যুদের মদদদাতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। দস্যুদের বিরুদ্ধে করা বিভিন্ন মামলাও দীর্ঘসূত্রতার কবলে। তাই ব্যাহত হচ্ছে তাদের জীবনে ফেরার প্রক্রিয়া। 


এবার আসি লেখার ব্যাপারে। লেখক সাহিত্যিক নন, বরং পেশাদার সাংবাদিক। শুরুতে চমৎকার ডিটেইলিং থাকলেও লেখক তা ধরে রাখতে পারেন নি। প্রথম দুতিন অধ্যায়ে অভিযান নিয়ে বেশ বিস্তৃত লেখা থাকলেও, শেষ দিকে দস্যুনেতাদের তুলে আনার কথা যেভাবে লিখেছেন, যেন তা মাছ তুলে আনার মতো ব্যাপার। লেখক এলাকার ভৌগলিক বর্ণনায় ভালোই নজর দিয়েছেন। ম্যাপের সাথে অল্প আয়াশে মেলানো যাচ্ছিল। কিন্তু তার সিকিভাগও দেন নি প্রাকৃতিক বর্ণনায়। বেশকিছু রোমহষর্ক ঘটনা ছিল এই যেমন একজায়গায় গভীর রাতে বাঘের পাল্লায় পড়ার অভিজ্ঞতা, কিন্তু বর্ণনাগুলো নিস্পৃহতা খুবই বেশি মাত্রায় লক্ষণীয় ছিল। শেষ অধ্যায়ে কয়েকপৃষ্ঠা জুড়ে কৃতজ্ঞতা বর্ণনা লেখার চেয়ে কৃতজ্ঞতা স্বীকার তালিকা দেয়ায় যুক্তিযুক্ত ছিল। অবশ্য ছোটখাটো অসন্তুষ্টগুলো নিয়ে অনেকদিন পর একটা বই পড়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেছি। 

জীবনে ফেরা গল্প
মোহসীন-উল-হাকিম
আল-হামরা প্রকাশনী

Buy Original Copy :- Click Here ☑️

if any pdf download link do not work, please use any pvn and try again